নবম পে-স্কেলের গেজেট সত্যিই প্রকাশিত, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেই মিলল প্রজ্ঞাপন
অবশেষে অবসান হলো দীর্ঘ প্রতীক্ষার। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ বা নবম পে-স্কেলের গেজেট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটের নোটিশ বোর্ডে ‘সরকারি চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ শিরোনামে প্রজ্ঞাপনটি দেখা যাচ্ছে। নোটিশটির তারিখও ১৯-০৯-২০২৬ এবং সেখানে এটি নতুন নোটিশ হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে।
ফলে নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে এতদিন যে সংশয়, গুঞ্জন বা অপেক্ষা ছিল, তা কার্যত শেষ হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে নোটিশটি দৃশ্যমান হওয়ায় এটিকে এখন আর শুধু সম্ভাব্য বা সূত্রনির্ভর খবর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই দিনে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও প্রজ্ঞাপন প্রকাশের খবর নিশ্চিত করেছে।
১ জুলাই থেকেই কার্যকর ধরা হবে নতুন বেতন কাঠামো
নতুন ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ অনুযায়ী পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। তবে নতুন মূল বেতনের পুরো সুবিধা একবারে কার্যকর না করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী—
- ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে।
- ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে বর্ধিত অংশের ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ৭৫ শতাংশ কার্যকর হবে।
- ১ জুলাই ২০২৭ থেকে নতুন কাঠামোর বর্ধিত মূল বেতনের শতভাগ কার্যকর হবে।
অর্থাৎ গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে শুধু নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলো না, বরং কোন তারিখ থেকে কত শতাংশ হারে নতুন বেতন কার্যকর হবে—তার আনুষ্ঠানিক কাঠামোও স্পষ্ট হলো।
সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা
নতুন পে-স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। তবে প্রতিটি গ্রেডের মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোতে—
২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ এ গ্রেডে বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১০০ শতাংশ।
এভাবে নতুন কাঠামোয় নিম্ন গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি রাখা হয়েছে। সরকারের অনুমোদিত কাঠামো সম্পর্কে অর্থ মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংবাদ সংকলনেও ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার এবং ১ম গ্রেডে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
২০২৮ সাল থেকে অন্যান্য ভাতার পূর্ণ সুবিধা
পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতা একই সময়ে পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোর আওতায় বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা সহায়ক, টিফিনসহ অন্যান্য ভাতার সুবিধা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। পেনশনভোগীরাও নতুন কাঠামোর আওতায় সুবিধা পাবেন।
অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে পে-স্কেল কার্যকর ধরা হলেও সম্পূর্ণ আর্থিক সুবিধা পেতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
বকেয়া পাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
যেহেতু নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, তাই কার্যকর তারিখ থেকে প্রাপ্য বর্ধিত বেতনের অংশ পরবর্তী সময়ে সমন্বয় বা বকেয়া হিসেবে পাওয়ার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে প্রাপ্য বর্ধিত বেতনের বকেয়া অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাবেন।
তবে বকেয়া ঠিক কোন মাসে, কীভাবে এবং কোন সফটওয়্যার/পে-ফিক্সেশন প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে, সেটি বাস্তবায়ন নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে।
প্রায় ২৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর প্রভাব
নতুন পে-স্কেলের আওতায় দেশের বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগী আসবেন। প্রকাশিত তথ্যে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে পে-স্কেল শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়; রাষ্ট্রের বাজেট, সরকারি ব্যয়, পেনশন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে কী নিশ্চিত হলো?
আজকের গেজেট প্রকাশের পর কয়েকটি বিষয় আর অনুমান বা আলোচনার মধ্যে থাকছে না।
প্রথমত, নতুন বেতন কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে জারি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এর কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধরা হয়েছে।
তৃতীয়ত, বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রয়েছে।
চতুর্থত, সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পঞ্চমত, মূল বেতন এক ধাপে নয়, তিন ধাপে পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে।
ষষ্ঠত, নতুন কাঠামোর অন্যান্য ভাতা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার জন্য ১ জানুয়ারি ২০২৮ তারিখ নির্ধারিত হয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি
নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে কয়েক মাস ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর থেকেই গেজেট প্রকাশের অপেক্ষা চলছিল। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং ও বিজি প্রেসের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার খবর আসে। ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্তও গেজেট প্রকাশ নিয়ে অপেক্ষা ছিল; ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকাশের প্রস্তুতির কথা জানান।
অবশেষে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অর্থ মন্ত্রণালয়ের নোটিশ বোর্ডে প্রজ্ঞাপনটি দৃশ্যমান হওয়ার মাধ্যমে সেই অপেক্ষার আনুষ্ঠানিক অবসান হলো।
এখন সামনে যে কাজগুলো
গেজেট প্রকাশের পর মূল চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়ন। বিশেষ করে—
১. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণ,
২. আইবাস++-এ নতুন বেতন কাঠামো সমন্বয়,
৩. ১ জুলাই থেকে প্রাপ্য বকেয়া হিসাব করা,
৪. ধাপভিত্তিক বেতন প্রদান,
৫. নতুন ভাতা কার্যকরের প্রস্তুতি,
৬. পেনশন পুনর্নির্ধারণ এবং
৭. সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর পৃথক বাস্তবায়ন নির্দেশনা জারি—
এসব কার্যক্রম এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে ‘গেজেট হবে কি না’—এই প্রশ্নের আর অবকাশ নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হওয়ায় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে গেজেটের বিধান অনুযায়ী নতুন বেতন কীভাবে নির্ধারণ হবে, কত টাকা বকেয়া হবে এবং কোন সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ধাপে ধাপে পূর্ণ সুবিধা হাতে পাবেন।


