২০৩০ নয়, ২০২৬ থেকেই ‘এক পদ, এক পেনশন’ চান প্রবীণ পেনশনাররা
নবম জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদনের পর সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা One Rank One Pension (OROP) ব্যবস্থা। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সামরিক ও অসামরিক অবসরপ্রাপ্তদের জন্য এই ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রবীণ পেনশনারদের একটি অংশ এই সময়সীমা এগিয়ে এনে চলতি ২০২৬ সাল থেকেই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের আবেদন জানিয়েছেন।
গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভা জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করে। নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো পেনশনারদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
কেন ২০৩০ পর্যন্ত অপেক্ষা নয়?
পেনশনারদের বক্তব্য, ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ শুধু একটি আর্থিক সুবিধার বিষয় নয়; এটি একই পদ, একই গ্রেড ও একই ধরনের চাকরির মেয়াদে অবসর নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈষম্য কমানোর একটি নীতিগত উদ্যোগ।
বর্তমান ব্যবস্থায় একই পদ ও একই ধরনের চাকরি থেকে ভিন্ন সময়ে অবসর নেওয়া ব্যক্তিদের পেনশনে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হতে পারে। নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে OROP কার্যকর হলে অবসর গ্রহণের বছরভিত্তিক বৈষম্য অনেকাংশে কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এই কারণেই প্রবীণ পেনশনারদের দাবি—যাঁরা সবচেয়ে বেশি বয়সী এবং তুলনামূলকভাবে কম পেনশন পাচ্ছেন, তাঁদের দিয়েই ২০২৬ সালে প্রথম ধাপ শুরু করা হোক।
সরকারের সিদ্ধান্তে কেন ২০৩০ সালের কথা বলা হয়েছে?
সরকারের ব্যাখ্যায় দুটি বড় বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমত, OROP একসঙ্গে বাস্তবায়ন করলে সরকারের ওপর বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় তথ্য সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গভাবে নেই। এসব কারণে একবারে পুরো ব্যবস্থা চালু না করে পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, সরকারের সিদ্ধান্তটি OROP বাতিল নয়; বরং বাস্তবায়নের সময়সীমা দীর্ঘ করা হয়েছে।
পেনশনারদের যুক্তি—ধাপে ধাপে শুরু করলেই সমাধান
প্রবীণদের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাবটি সামনে এসেছে, সেটি হলো—সরকার যেন ২০২৬ সাল থেকেই শতভাগ OROP বাস্তবায়নের পরিবর্তে অগ্রাধিকারভিত্তিক বাস্তবায়ন শুরু করে।
প্রথম ধাপে সবচেয়ে প্রবীণ পেনশনার, দীর্ঘদিন আগে অবসর নেওয়া ব্যক্তিরা এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। পরবর্তী ধাপে বয়স, অবসর সাল কিংবা পেনশনের স্তর বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে অন্যদের আওতায় আনা যেতে পারে।
এতে একদিকে সরকারের তাৎক্ষণিক ব্যয় একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে সবচেয়ে অসহায় প্রবীণদের জন্য দ্রুত আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
চিকিৎসা ব্যয়ই বড় বাস্তবতা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন পেনশনারের নিয়মিত জীবনযাত্রার ব্যয়ের পাশাপাশি চিকিৎসা ও ওষুধের খরচও বাড়ে। ফলে শুধু কাগজে পেনশনের হার নির্ধারণ করলেই প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
এ কারণেই পেনশনারদের দাবি, পেনশন সংস্কারের সুফল যত দ্রুত সম্ভব প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছানো প্রয়োজন।
নতুন পে স্কেলে অবশ্য পুরোনো পেনশনারদের জন্য নেট পেনশন বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিভিন্ন পেনশন স্তর বিবেচনায় কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পেনশন বৃদ্ধির হার সর্বনিম্ন প্রায় ৫৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্যভান্ডার নিয়ে প্রশ্নও উঠছে
সরকারের পক্ষ থেকে ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া অসামরিক কর্মচারীদের তথ্যের ঘাটতিকে OROP বাস্তবায়নের অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে পেনশনারদের একটি অংশের যুক্তি, বর্তমানে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো আগের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক। তাই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, ডেটাবেজ তৈরি এবং পেনশন পুনর্নির্ধারণের কাজকে বিশেষ প্রকল্প হিসেবে নিয়ে দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব কি না, সেটি সরকার বিবেচনা করতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—iBAS++ বা EFT ব্যবস্থায় বর্তমান পেনশন প্রদানের সক্ষমতা থাকা আর অতীতের সব অবসরপ্রাপ্তের পূর্ণাঙ্গ চাকরির তথ্য থাকা এক বিষয় নয়। তাই OROP বাস্তবায়নে শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নয়, পুরোনো রেকর্ড যাচাই ও প্রশাসনিক সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সাল থেকেই শুরু হলে কীভাবে করা যেতে পারে?
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে নীতিগতভাবে একটি সম্ভাব্য রোডম্যাপ হতে পারে—
প্রথম ধাপ: সর্বোচ্চ বয়সী ও সবচেয়ে কম পেনশনপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্তি।
দ্বিতীয় ধাপ: নির্দিষ্ট অবসর সাল পর্যন্ত পুরোনো পেনশনারদের পেনশন পুনর্নির্ধারণ।
তৃতীয় ধাপ: সামরিক ও অসামরিক অবসরপ্রাপ্তদের জন্য অভিন্ন নীতিমালা অনুযায়ী অবশিষ্ট শ্রেণিগুলো অন্তর্ভুক্ত করা।
চূড়ান্ত ধাপ: ২০৩০ সালের আগেই পূর্ণাঙ্গ OROP বাস্তবায়নের চেষ্টা।
এটি বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই নির্দিষ্ট ফিটমেন্ট ফর্মুলা, যোগ্যতার মানদণ্ড, পেনশন পুনর্নির্ধারণের তারিখ, বকেয়া পাওনার হিসাব এবং অর্থের উৎস স্পষ্ট করতে হবে।
নতুন পে স্কেলের সঙ্গে OROP-এর সম্পর্ক
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর সঙ্গে OROP-এর বিষয়টি যুক্ত হলেও দুটিকে একই সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। নতুন পে স্কেল মূলত কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পরিবর্তন করছে; অন্যদিকে OROP হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে অবসর নেওয়া একই গ্রেড/পদের পেনশনারদের মধ্যে পেনশন বৈষম্য কমানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা।
নতুন পে স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং মূল বেতন পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে OROP-এর পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্য রাখা হয়েছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ, ২০২৬ সালে পে স্কেল কার্যকর হলেও OROP স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই সময়ে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হচ্ছে না।
এখন মূল দাবি—সময় কমানো
প্রবীণ পেনশনারদের আবেদনটির মূল বক্তব্য তাই খুব স্পষ্ট—সরকার যখন OROP নীতিগতভাবে গ্রহণ করেছে, তখন ২০৩০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা না করে ২০২৬ সালেই এর প্রথম ধাপ শুরু করা হোক।
তাঁদের মতে, এতে সরকারের ওপর একবারে বড় আর্থিক চাপ পড়বে না। বরং বয়স, পেনশনের পরিমাণ ও অবসর গ্রহণের সময় বিবেচনায় নিয়ে একটি অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করা গেলে সবচেয়ে প্রয়োজনগ্রস্ত পেনশনাররা আগে সুবিধা পাবেন।
এ ধরনের প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগে অবশ্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, পেনশন ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি—সবকিছু পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ সরকার নিজেই জানিয়েছে, OROP একসঙ্গে বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে।
মানবিক আবেদন, প্রশাসনিক বাস্তবতা
সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে স্কেল-২০২৬ অনুমোদনের পর পেনশনারদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দরজা খুলেছে। সরকার ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু পূর্ণ বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে।
এখন প্রবীণ পেনশনারদের প্রত্যাশা, চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নির্ধারণের সময় সরকার যেন বিষয়টি আরও একবার মানবিক ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে।
২০৩০ সালের লক্ষ্য বহাল রেখেও ২০২৬ সালে প্রথম ধাপ শুরু করা সম্ভব কি না—এটাই এখন প্রবীণ পেনশনারদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
কারণ তাঁদের বক্তব্যের সারকথা হলো—ন্যায্য পেনশনের সুবিধা শুধু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নয়, যাঁরা কয়েক দশক রাষ্ট্রের সেবা দিয়ে আজ জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছেন, তাঁদের কাছেও দ্রুত পৌঁছানো প্রয়োজন।

