স্থায়ী ঠিকানায় জমি আছে কিন্তু বাড়ি বা হোল্ডিং ট্যাক্স নেই: নাগরিকত্ব সনদ মিলবে কীভাবে? আইন যা বলছে
মালিকানা জমি থাকার পরও শুধুমাত্র বাড়ি না থাকায় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নাগরিকত্ব সনদ না পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জমি কিনে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন সাধারণ নাগরিকরা। অনেকেই আইনগত বিধান ও স্থানীয় সরকার কাঠামোর সঠিক ধারণা না থাকায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিকত্ব বা স্থানীয় বাসিন্দার সনদের ক্ষেত্রে ভূমি মালিকানা এবং বাস্তব বসতি বা বসবাসের স্থায়ীত্বের বিষয়টি আইনগতভাবে ভিন্নভাবে দেখা হয়।
বর্তমান জটিলতার নেপথ্য কারণ
আইন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব বা বাসিন্দার সনদ প্রদানের মূল ভিত্তি হলো সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিয়মিত বসবাস বা স্থায়ীভাবে নিবাসী হওয়া। নাগরিকরা মনে করেন, কোনো এলাকায় জমি কেনা এবং নামজারি খতিয়ান (Mutation) সম্পন্ন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে গণ্য হওয়া যাবে।
তবে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন অনুযায়ী, শুধুমাত্র জমি বা প্লট থাকা এবং সেখানে স্থায়ী বসতি না থাকার কারণে হোল্ডিং ট্যাক্স (হোল্ডিং কর) বা রেভিনিউ রসিদ না থাকলে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অনেক ক্ষেত্রে সনদ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কেননা, চেয়ারম্যানকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্থায়ী বসবাস নিশ্চিত করেই সনদ প্রদান করতে হয়।
আইনি বিধান ও প্রচলিত সংজ্ঞা
আইন ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল জমি কিনলেই বা নামজারি করলেই কেউ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান না। সাধারণত স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট এলাকায় টানা বা দীর্ঘ সময় বসবাস করার শর্তটি এখানে প্রযোজ্য।
একাধিক স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহারের মাধ্যমে অননুমোদিত সুবিধা গ্রহণ রোধে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থাকে। ফলে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং বাস্তব বসবাসের ঠিকানার মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে সনদ পাওয়া নিয়ে এ ধরনের জটিলতা তৈরি হয়।
ভুক্তভোগীদের জন্য করণীয় ও প্রতিকার
চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে নাগরিকত্ব সনদ না পেলে বা অনীহা প্রকাশ করলে নাগরিকদের জন্য আইনগতভাবে কিছু সুনির্দিষ্ট পথ খোলা রয়েছে:
১. ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী অফিসার) এর শরণাপন্ন হওয়া: ইউনিয়ন পরিষদের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হলে বা যথাযথ সহযোগিতা না পেলে নাগরিকরা সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (UNO) সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। ইউএনও মহোদয় সার্বিক তথ্যাদি যাচাই করে আইনগত পথ বা সঠিক নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন।
২. জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর আবেদন: প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রমাণপত্র (নামজারি খতিয়ান, দলিল ও জমির কাগজ) সংযুক্ত করে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদন করা যেতে পারে।
৩. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এর ঠিকানা সংশোধন বা ব্যবহার: যদি স্থায়ী জমি না থাকার কারণে পূর্বে বর্তমান বা অস্থায়ী ঠিকানায় ভোটার হয়ে থাকেন, তবে NID-তে উল্লেখিত স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। কিংবা আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে NID-র ঠিকানা হালনাগাদ করার সুযোগও রয়েছে।
৪. সরাসরি আইনি পরামর্শ বা হটলাইন সেবা: জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি তথ্য ও সেবা পেতে নির্দিষ্ট হেল্পলাইন নম্বরে (যেমন: ১০৬ বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবা পোর্টাল) যোগাযোগ করে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জমি কেনা এবং নামজারি করা এক জিনিস, আর স্থানীয় সরকারের অধীনে স্থায়ী বসবাস প্রমাণ করা সম্পূর্ণ আলাদা প্রক্রিয়া। তাই স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা এবং আইনি বিধান মেনে আবেদন করলে এ ধরনের জটিলতা সহজেই নিরসন করা সম্ভব।

