৯ম পে স্কেল নিউজ

১১ বছর পর বেতন বাড়ল মাত্র ১৩৫২ টাকা: ‘ডাবল’ প্রচারের পেছনের ভিন্ন বাস্তবতা

দীর্ঘ ১১ বছর পর দেশে নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের পর থেকেই চারদিকে চলছে তুমুল আলোচনা—সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নাকি এক লাফে দ্বিগুণ (ডাবল) হয়ে গেছে। তবে সাধারণ মানুষের মাঝে চলা এই ধারণার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই বলে দাবি করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আবদুল মালেক। সম্প্রতি নিজের বেতনের চুলচেরা হিসাব তুলে ধরে তিনি দেখিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামোর প্রথম ধাপে তাঁর মতো চাকরিজীবীদের পকেটে বাড়তি যুক্ত হচ্ছে নামমাত্র কিছু টাকা।

‘বেতন ডাবল’ প্রচার বনাম বাস্তব চিত্র

নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর গণমাধ্যম ও জনপরিসরে প্রচার পায় যে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তবে এই প্রচারকে বাস্তবসম্মত নয় বলে উল্লেখ করে আবদুল মালেক বলেন, “১১ বছর পরে আমার বেতন বাড়ছে ১৩৫২ টাকা, অথচ সারা দেশ বলছে বেতন ডাবল হয়েছে—বাস্তবতা কী বলে?” তাঁর মতে, এ ধরনের অতিরঞ্জিত প্রচার বাজারে কৃত্রিমভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও পণ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ও সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের জন্যই ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আবদুল মালেকের বেতনের হিসাব: এক নজরে

নিজের বিবৃতির মাধ্যমে আবদুল মালেক তাঁর বেতন বৃদ্ধির যে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিয়েছেন, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

  • মূল বেতনের পার্থক্য: ২০১৫ সালের পে-স্কেলে তাঁর মূল বেতন ২৪,২৬০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে ২০২৬ সালের ১ জুলাই দাঁড়ায় ৪৩,৬৩০ টাকা। অর্থাৎ আগের মূল বেতনের সঙ্গে পার্থক্য দাঁড়ায় ১৯,৩৭০ টাকা।

  • নতুন মূল বেতন নির্ধারণ: নতুন পে-স্কেলের প্রারম্ভিক মূল বেতনের (যেমন: ৪৪,০০০ টাকা) সঙ্গে এই সার্ভিস বেনিফিট বা ১৯,৩৭০ টাকা যুক্ত হয়ে তাঁর নতুন মূল বেতন নির্ধারিত হয় ৬৩,৩৭০ টাকা।

  • বর্ধিত মূল বেতন: নতুন মূল বেতন (৬৩,৩৭০ টাকা) থেকে আগের পে-স্কেলের শেষ মূল বেতন (৪৩,৬৩০ টাকা) বাদ দিলে বর্ধিত মূল বেতন থাকে ১৯,৭৪০ টাকা।

  • প্রথম ধাপের হিসাব: নবম পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা রয়েছে, যার প্রথম ধাপে নতুন বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ কার্যকর হবে। সেই হিসেবে ১৯,৭৪০ টাকার ৪০ শতাংশ বা ৭,৮৯৬ টাকা আগের মোট বেতনের সঙ্গে যোগ হওয়ার কথা।

  • বিশেষ সুবিধা বাতিল ও নিট বৃদ্ধি: ২০২৬ সালের ১ জুলাই তাঁর আগের মোট বেতন ছিল ৬৭,২৯০ টাকা। এর সঙ্গে প্রথম ধাপের বর্ধিত ৭,৮৯৬ টাকা যোগ করলে মোট বেতন হয় ৭৫,১৮৬ টাকা। তবে নতুন পে-স্কেল চালুর ফলে বর্তমান চলমান বিশেষ সুবিধা (১ম থেকে ৯ম গ্রেডের জন্য ১০%) বাবদ ৬,৫৪৪ টাকা বাতিল বা বাদ যাবে।

  • চূড়ান্ত ব্যবধান: ৭৫,১৮৬ টাকা থেকে বিশেষ সুবিধার ৬,৫৪৪ টাকা বাদ দিলে নতুন বেতন দাঁড়ায় ৬৮,৬৪২ টাকা। এই নতুন হিসাব থেকে আগের মোট বেতন (৬৭,২৯০ টাকা) বিয়োগ করলে দেখা যায়, প্রথম ধাপে তাঁর প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছে মাত্র ১,৩৫২ টাকা

সবার ক্ষেত্রে কি একই চিত্র প্রযোজ্য?

আবদুল মালেক স্পষ্ট করেছেন যে, এটি সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত ইনক্রিমেন্ট, চাকরির দীর্ঘ মেয়াদ এবং বিদ্যমান সুবিধার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা একটি হিসাব। সব সরকারি চাকরিজীবীর বেতন ঠিক এই পরিমাণে বাড়বে না। চাকরির গ্রেড, বয়স, বর্তমান মূল বেতন এবং সুযোগ-সুবিধার তারতম্যের ওপর ভিত্তি করে একেক জনের ক্ষেত্রে অঙ্কটা ভিন্ন হতে পারে। তবে প্রথম ধাপে অধিকাংশ চাকরিজীবীর ক্ষেত্রেই মূল বেতনের বড় কোনো উল্লম্ফন না ঘটে নামমাত্র ২ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে তাঁর ধারণা।

বাজারমূল্য ও দ্রব্যমূল্যের চাপ নিয়ে উদ্বেগ

বেতন দ্বিগুণ হওয়ার এই ভুল প্রচারের কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন আবদুল মালেক। তাঁর মতে, তাঁর সম্পূর্ণ বেতন বা ডাবল সুবিধা পেতে পেতে ২০২৮ সাল বা তার বেশি সময় লেগে যাবে। কিন্তু তার আগেই বাজারে দ্রব্যমূল্য এমন পর্যায়ে পৌঁছে যাবে যে তা চাকরিজীবীদের জন্য অসহনীয় হয়ে দাঁড়াবে। তাই গুজবে কান না দিয়ে সঠিক তথ্য প্রচার করা এবং বাজারদর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *