নবম পে স্কেলের বকেয়া বিল দাখিল হবে অফলাইনে, প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য আলাদা বিল প্রস্তুতের নিয়ম
নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। নতুন বেতন কাঠামোতে নির্ধারিত বেতন কার্যকর হওয়ার পর বকেয়া অর্থ উত্তোলনের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইবাস++ (iBAS++) সফটওয়্যারে বিল তৈরি কিংবা অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ থাকছে না বলে একটি তথ্যচিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। বরং প্রচলিত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বকেয়া বিল আলাদাভাবে প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে দাখিল করতে হবে।
এতে সরকারি দপ্তরগুলোতে বকেয়া বিল প্রস্তুত, যাচাই-বাছাই এবং হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানোর কার্যক্রম নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন পেয়েছেন, তাঁদের বকেয়া অর্থ উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে।
বকেয়া বিলের জন্য অনলাইন সুবিধা থাকছে না, করতে হবে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে
নতুন পে স্কেলের বকেয়া বিল দাখিলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিল আইবাস++ সিস্টেম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেনারেট করার কোনো সুযোগ নেই বলে তথ্যচিত্রে জানানো হয়েছে। একইভাবে অনলাইনে সরাসরি বকেয়া বিল সাবমিট করার ব্যবস্থাও উল্লেখ করা হয়নি।
ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রচলিত কাগজভিত্তিক পদ্ধতিতে বকেয়া বিল প্রস্তুত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেতন বিবরণী, বকেয়া হিসাবের ছক এবং প্রয়োজনীয় বিল ফরম পূরণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হিসাবরক্ষণ অফিসে জমা দিতে হবে।
অর্থাৎ, নতুন পে স্কেলের বেতন নির্ধারণ আইবাস++-এ সম্পন্ন হলেও বকেয়া অর্থ উত্তোলনের জন্য আলাদা ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। বেতন নির্ধারণ এবং বকেয়া বিল দাখিল দুটি পৃথক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হবে।
১ নভেম্বর থেকে বকেয়া বিল দাখিলের সুযোগ
তথ্যচিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে নতুন পে স্কেলের প্রথম নিয়মিত বেতন (অক্টোবর মাসের বেতন) ইএফটি (EFT) পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে সফলভাবে জমা হওয়ার পর থেকে ম্যানুয়াল বকেয়া বিল হিসাবরক্ষণ অফিসে দাখিল করা যাবে।
এ ক্ষেত্রে নতুন বেতন পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন এবং পূর্ববর্তী সময়ের প্রাপ্য বেতনের পার্থক্য হিসাব করে বকেয়া অর্থ নির্ধারণ করতে হবে।
তবে বকেয়া বিল দাখিলের সুযোগ তৈরি হওয়া এবং বিলের অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়া এক বিষয় নয়। বিল প্রস্তুত, দাখিল, যাচাই-বাছাই এবং অনুমোদনের পরই অর্থ ছাড়ের কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বকেয়া বিল আলাদাভাবে প্রস্তুত করতে হবে
বকেয়া বিল নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য একত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে না। বরং প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত বেতন ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী বকেয়া হিসাব প্রস্তুত করতে হবে।
কারণ একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হলেও প্রত্যেকের বেতন, গ্রেড, পদ, যোগদানের তারিখ, ইনক্রিমেন্ট এবং অন্যান্য প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে প্রত্যেকের বকেয়া অর্থের পরিমাণও এক রকম হবে না।
এ কারণে ব্যক্তিভিত্তিক বকেয়া হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর মূল বেতন, নতুন বেতন স্কেলে নির্ধারিত বেতন এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে হিসাব সম্পন্ন করতে হবে।
গেজেটেড কর্মকর্তাদের বকেয়া বিল দাখিলের নিয়ম
তথ্যচিত্র অনুযায়ী, গেজেটেড কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে নিজ নিজ আইডি থেকে ম্যানুয়ালি TR Form 13 পূরণ করতে হবে। এটি গেজেটেড কর্মকর্তার বেতন বিলের নির্ধারিত ফরম।
এর পাশাপাশি বকেয়া হিসাব বিবরণী ছক প্রস্তুত করতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করে টোকেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এজি (AG) অফিস অথবা হিসাবরক্ষণ অফিসে জমা দিতে হবে।
অর্থাৎ, গেজেটেড কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে নিজস্ব বেতন বিল প্রস্তুত এবং বকেয়া হিসাব বিবরণী তৈরির দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। দাখিল করা কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
নন-গেজেটেড কর্মচারীদের বকেয়া বিল প্রস্তুতের নিয়ম
নন-গেজেটেড কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি কিছুটা ভিন্ন। তাঁদের বকেয়া বিল প্রস্তুতের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ড্রয়িং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার (DDO) বা আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তার ওপর থাকবে।
তথ্যচিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট DDO ম্যানুয়ালি বেতন বিল এবং বকেয়া হিসাব বিবরণী ছক প্রস্তুত করবেন। এরপর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিলটি হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠাতে হবে।
এ ক্ষেত্রে কর্মচারীদের নিজ নিজ দপ্তরের হিসাব শাখা বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক শাখার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। বকেয়া হিসাব প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে সরবরাহ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বকেয়া বিল প্রস্তুতের সময় যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
বকেয়া বিল প্রস্তুতের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
১. নতুন পে স্কেল অনুযায়ী নির্ধারিত বেতনের তথ্য সঠিক হতে হবে।
২. পূর্ববর্তী বেতন এবং নতুন বেতনের পার্থক্য যথাযথভাবে হিসাব করতে হবে।
৩. সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত বেতন বিবরণী প্রস্তুত করতে হবে।
৪. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বকেয়া হিসাব বিবরণী ছক পূরণ করতে হবে।
৫. গেজেটেড কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত TR Form 13 অনুসরণ করতে হবে।
৬. নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট DDO-এর মাধ্যমে বিল প্রস্তুত করতে হবে।
৭. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অনুমোদন সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল জমা দিতে হবে।
এখানে উল্লেখ্য, বকেয়া হিসাবের সময় কোন কোন ভাতা, ইনক্রিমেন্ট বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা অন্তর্ভুক্ত হবে, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
আইবাস++-এ বেতন নির্ধারণ হলেও বকেয়া বিল কেন ম্যানুয়ালি?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে আইবাস++ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ, তথ্য যাচাই এবং নিয়মিত বেতন প্রদানের কার্যক্রম এই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তবে বকেয়া বিলের ক্ষেত্রে আলাদা হিসাব প্রস্তুত করার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির ইতিহাস, বেতন কাঠামো এবং প্রাপ্য অর্থের পরিমাণ আলাদা হতে পারে।
তাই বকেয়া বিল প্রস্তুতের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভিত্তিক হিসাব বিবরণী তৈরি করে প্রচলিত বিল দাখিল প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে।
বকেয়া টাকা কবে পাওয়া যাবে?
বকেয়া বিল ম্যানুয়ালি দাখিলের সুযোগ থাকলেও টাকা পাওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে তথ্যচিত্রে কোনো সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।
প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বকেয়া হিসাব প্রস্তুত করতে হবে। এরপর বিল যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হিসাবরক্ষণ অফিসে জমা দিতে হবে। হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই-বাছাই, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
তাই বিল দাখিলের পরপরই সবার ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হবে, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। দপ্তরভেদে বিল প্রস্তুত ও যাচাইয়ের সময়েও পার্থক্য হতে পারে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এখন কী করণীয়?
নতুন পে স্কেলের নিয়মিত বেতন পাওয়ার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এখন থেকেই বকেয়া হিসাবের বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে যাঁদের বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হয়েছে, তাঁদের নিজ নিজ অফিসের হিসাব শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করে বকেয়া বিল প্রস্তুতের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে হবে।
গেজেটেড কর্মকর্তারা নির্ধারিত ফরম ও বকেয়া হিসাব বিবরণী প্রস্তুতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। অন্যদিকে নন-গেজেটেড কর্মচারীরা তাঁদের সংশ্লিষ্ট DDO-এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রত্যেকের বকেয়া হিসাব আলাদাভাবে প্রস্তুত করতে হবে। তাই নিজের বেতন বিবরণী, পে-ফিক্সেশন সংক্রান্ত তথ্য এবং চাকরিসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক আছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া উচিত।
শেষ কথা
নবম জাতীয় পে স্কেলের বকেয়া বিল নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও অপেক্ষা রয়েছে। বিশেষ করে বকেয়া বিল আইবাস++ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে, নাকি আলাদাভাবে আবেদন করতে হবে—এ নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল।
প্রকাশিত তথ্যচিত্র অনুযায়ী, বকেয়া বিলের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে এবং প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য পৃথকভাবে বকেয়া হিসাব প্রস্তুত করতে হবে। গেজেটেড কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত TR Form 13 এবং নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট DDO-এর মাধ্যমে বিল প্রস্তুতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিল দাখিলের চূড়ান্ত নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অর্থ ছাড়ের সময়সীমা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অর্থ বিভাগ ও হিসাবরক্ষণ অফিসের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
সুতরাং, নতুন পে স্কেলের বকেয়া অর্থ পেতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এখন প্রধান কাজ হলো নিজের বকেয়া হিসাব সঠিকভাবে প্রস্তুত করা এবং নির্ধারিত নিয়মে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল দাখিলের ব্যবস্থা করা।

মন্তব্য (০)