শিশুর জন্ম নিবন্ধন ২০২৬: পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন না থাকলেও কি করা যাবে?
শিশুর জন্মের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিগুলোর একটি হলো জন্ম নিবন্ধন সনদ। স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন অনুযায়ী জন্ম নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক।
তবে অনেক অভিভাবকের প্রশ্ন—পিতা ও মাতার নিজেদের জন্ম নিবন্ধন সনদ না থাকলে সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করা যাবে কি না? ২০২৬ সালেও বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধু পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন নেই—এ কারণে শিশুর জন্ম নিবন্ধনের অধিকার বন্ধ হয়ে যায় না। তবে পরিচয় ও বয়সের প্রমাণ যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক কার্যালয়ের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন না থাকলে কী করবেন?
পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন সনদ না থাকলে প্রথমেই বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধক কার্যালয়ে যোগাযোগ করা উচিত। সরকারি FAQ-তে পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন সংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রে তাদের বয়স ও পরিচয় প্রমাণের জন্য বিকল্প সরকারি নথি ব্যবহারের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী শিক্ষাগত সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র যাচাই করা হতে পারে।
অর্থাৎ, ‘বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন নেই, তাই সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করা যাবে না’—এমন সরল সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিল যাচাই করে আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।
শিশুর জন্ম নিবন্ধনে কী তথ্য প্রয়োজন?
শিশুর জন্ম নিবন্ধনের আবেদনে সাধারণত শিশুর—
- নাম;
- জন্মতারিখ;
- জন্মস্থান;
- পিতা ও মাতার নাম;
- পিতা-মাতার পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য;
- ঠিকানা;
- জাতীয়তা;
- প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র
ইত্যাদি তথ্য দিতে হয়।
বর্তমানে জন্ম নিবন্ধনের জন্য অনলাইন ব্যবস্থাও চালু রয়েছে এবং রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে নতুন জন্ম নিবন্ধনের আবেদন, আবেদনের বর্তমান অবস্থা এবং অন্যান্য ডিজিটাল সেবার ব্যবস্থা রয়েছে।
পিতা-মাতার NID থাকলে কী হবে?
কোনো পিতা বা মাতার জন্ম নিবন্ধন না থাকলেও যদি তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ পরিচয় ও বয়সের গ্রহণযোগ্য প্রমাণ থাকে, তাহলে তা নিয়ে নিবন্ধক কার্যালয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে। সরকারি FAQ অনুযায়ী, পিতা-মাতার বয়স প্রমাণের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত সনদ অথবা তদন্তসহ জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—কোন দলিল কোন পরিস্থিতিতে গ্রহণ করা হবে, তা সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের যাচাই ও প্রযোজ্য বিধিমালার ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই শুধু অনলাইনে আবেদন করে কোনো কাগজ ছাড়াই নিবন্ধন হয়ে যাবে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
শিশুর জন্মের কত দিনের মধ্যে নিবন্ধন করা উচিত?
জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব শিশুর জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন করা উচিত। সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থায় জন্ম নিবন্ধনকে নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার ও পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ও জন্ম নিবন্ধনকে শিশুর নাম, জাতীয়তা ও পিতামাতার পরিচয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশেষ করে শিশুর স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট তৈরি, পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণের সময় জন্ম নিবন্ধনের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে।
কোথায় আবেদন করবেন?
শিশুর জন্ম নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্ট জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধক কার্যালয়ে আবেদন করতে হয়। এলাকার ধরন অনুযায়ী নিবন্ধক কার্যালয় হতে পারে—
- ইউনিয়ন পরিষদ;
- পৌরসভা;
- সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক কার্যালয়;
- ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড;
- বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস/মিশন।
দেশজুড়ে বিভিন্ন নিবন্ধক কার্যালয়ের মাধ্যমে অনলাইন জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অনলাইনে আবেদন করার ক্ষেত্রে সতর্কতা
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করার সময় শিশুর নাম, জন্মতারিখ, পিতা-মাতার নাম এবং অন্যান্য তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দিতে হবে। কারণ জন্ম নিবন্ধনের তথ্য পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত নথি এবং অন্যান্য সরকারি নথির সঙ্গে ব্যবহৃত হতে পারে।
বিশেষ করে পিতা-মাতার নামের বানান, জন্মতারিখ এবং শিশুর জন্মতারিখে ভুল থাকলে পরবর্তীতে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের জন্যও আলাদা ডিজিটাল সেবা রয়েছে।
পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন আগে করা ভালো কি?
যদি পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন না থাকে, তাহলে পিতা-মাতার নিজেদের জন্ম নিবন্ধনের বিষয়টিও দ্রুত নিয়মমাফিক সম্পন্ন করা ভালো। এতে পরবর্তীতে সন্তানের জন্ম নিবন্ধনসহ পরিবারের অন্যান্য সরকারি নথিতে তথ্যের সামঞ্জস্য বজায় রাখা সহজ হয়।
তবে কোনো শিশুর জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন না থাকার কারণে আবেদনকারীকে সরাসরি ‘নিবন্ধন করা যাবে না’ বলে দেওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রযোজ্য পদ্ধতি ও বিকল্প প্রমাণপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি FAQ-তেও এ ধরনের পরিস্থিতির সমাধানের নির্দেশনা রয়েছে।
৪৫ দিনের পর জন্ম নিবন্ধন করলে কী হবে?
জন্ম নিবন্ধন যত দ্রুত করা যায় ততই ভালো। দেরিতে আবেদন করলে বয়স ও জন্মের তথ্য প্রমাণের জন্য অতিরিক্ত কাগজপত্র বা যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। তাই শিশুর জন্মের পরপরই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে আবেদন করা অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক কার্যালয়ের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত। কারণ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রক্রিয়া আবেদনকারীর বয়স, জন্মস্থান, জন্মের সময় এবং অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি সম্পর্কে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় পৃথকভাবে নির্দেশনাও প্রকাশ করেছে।
জন্ম নিবন্ধন করতে গিয়ে সমস্যা হলে কোথায় যোগাযোগ করবেন?
জন্ম নিবন্ধনের আবেদন, সংশোধন, পুনর্মুদ্রণ কিংবা অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
এছাড়া রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে বর্তমানে BDRIS সার্ভার সংক্রান্ত তথ্য এবং সহায়তার জন্য যোগাযোগের ব্যবস্থাও দেওয়া রয়েছে। সরকারি ওয়েবসাইটে BDRIS-সংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রে ১৬১৫২ নম্বরে যোগাযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল কথা
২০২৬ সালে শিশুর জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক পরিচয় ও জন্মতথ্য প্রমাণ করা। পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন সনদ না থাকলেই শিশুর জন্ম নিবন্ধন অসম্ভব—এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে পিতা-মাতার পরিচয় ও বয়সের তথ্য যাচাইয়ের জন্য NID, শিক্ষাগত সনদ বা পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্যান্য গ্রহণযোগ্য দলিল প্রয়োজন হতে পারে।
তাই সন্তানের জন্মের পর পিতা-মাতার জন্ম নিবন্ধন না থাকলে আবেদন বন্ধ না রেখে প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র ও প্রমাণপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধক কার্যালয়ে যোগাযোগ করাই নিরাপদ পদ্ধতি। অনলাইন আবেদন করার আগে তথ্যগুলো ভালোভাবে যাচাই করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে জন্ম নিবন্ধন সংশোধন নিয়ে জটিলতা তৈরি না হয়।
সরকারি তথ্যসূত্র: রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন; BDRIS।

