৯ম পে স্কেল নিউজ

নতুন পে স্কেলে বাতিল হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের বিশেষ প্রণোদনা

নতুন জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বর্তমানে চালু থাকা ‘বিশেষ সুবিধা’ বা বিশেষ প্রণোদনা বাতিল হতে যাচ্ছে। নতুন বেতন কাঠামোতে মূল বেতন ও বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণের অংশ হিসেবেই বিদ্যমান এই অতিরিক্ত সুবিধা আর আলাদাভাবে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না বলে সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

২০২৪ সালে শুরু, পরে বাড়ে বিশেষ সুবিধা

মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ২০২৪ সালে বিশেষ প্রণোদনা চালু করা হয়। শুরুতে মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রেডভেদে সুবিধাটি আরও পুনর্বিন্যাস করা হয়—১ম থেকে ৯ম গ্রেডের জন্য ১০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য ১৫ শতাংশ হারে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিধান করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নোটিশেও গ্রেডভেদে বিশেষ সুবিধা প্রদানের বিষয়টি রয়েছে।

অর্থাৎ বর্তমানে একজন সরকারি চাকরিজীবীর মূল বেতনের পাশাপাশি গ্রেড অনুযায়ী অতিরিক্ত ১০ বা ১৫ শতাংশ অর্থ যুক্ত হচ্ছে। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে এই অতিরিক্ত অংশটি আর আলাদাভাবে পাওয়া যাবে না বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে।

কেন বাতিল হচ্ছে বিশেষ সুবিধা?

নতুন পে স্কেলের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোকে নতুন করে সাজানো। সে কারণে পুরোনো বেতন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত অস্থায়ী বা অন্তর্বর্তীকালীন কিছু আর্থিক সুবিধাকে নতুন কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে।

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিশেষ সুবিধা বাতিল হওয়া মানেই নতুন পে স্কেলে মূল বেতন কমে যাওয়া নয়। বরং নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন পুনর্নির্ধারণের পর পুরোনো বিশেষ সুবিধাটি আলাদা একটি অতিরিক্ত অংশ হিসেবে থাকবে না।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নতুন পে স্কেলে বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পাশাপাশি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাতেও পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।

১০ থেকে ১৫ শতাংশ সুবিধা হারাবেন কারা?

বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের চাকরিজীবীরা ১০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীরা ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে এই সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে দুই শ্রেণির কর্মচারীর ক্ষেত্রেই নতুন বেতন হিসাব হবে সংশোধিত মূল বেতন ও নতুন ভাতার কাঠামো অনুযায়ী।

এ কারণে শুধু ‘১০ শতাংশ বা ১৫ শতাংশ সুবিধা বাতিল’ বললে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। একজন কর্মচারীর প্রকৃত আয় কতটা পরিবর্তিত হবে, তা নির্ভর করবে নতুন মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, টিফিন, যাতায়াতসহ অন্যান্য ভাতার সম্মিলিত হিসাবের ওপর।

মূল বেতন বাড়লেও বিশেষ সুবিধা থাকবে না

নতুন পে স্কেল নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন ইনক্রিমেন্ট কাঠামোর কথাও উঠে এসেছে। বর্তমান ব্যবস্থায় সব গ্রেডে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট থাকলেও নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে ইনক্রিমেন্টের হার ভিন্ন করার প্রস্তাব রয়েছে। গ্রেড ২০ থেকে গ্রেড ৬ পর্যন্ত ৫ শতাংশ, গ্রেড ৫-এ ৪ শতাংশ, গ্রেড ৪ ও ৩-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড ২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে নতুন কাঠামোয় যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলা নববর্ষ ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নামানোর কথা বলা হয়েছে।

ফলে নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব নির্ধারণ করতে হলে শুধু বিশেষ প্রণোদনা বাতিলের হিসাব করলেই হবে না; সব পরিবর্তন একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

‘বিশেষ সুবিধা’, ‘মহার্ঘ ভাতা’ ও ‘পে স্কেল’—এক বিষয় নয়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে প্রচলিত কথাবার্তায় ‘বিশেষ প্রণোদনা’, ‘বিশেষ সুবিধা’ ও ‘মহার্ঘ ভাতা’ অনেক সময় একই অর্থে ব্যবহার করা হলেও প্রশাসনিকভাবে এগুলো সবসময় অভিন্ন কোনো সুবিধা নয়।

বর্তমানে যে ১০ ও ১৫ শতাংশ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, সরকারি নথি ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সেটিকে মূলত ‘বিশেষ সুবিধা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর ‘মহার্ঘ ভাতা’ নামে আলাদা কোনো সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা চালু হবে—এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন বা চূড়ান্ত আদেশের ভাষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন বেতন কাঠামোয় কী হচ্ছে?

নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো–২০২৬ নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শুধু মূল বেতন নয়—পুরো পারিশ্রমিক কাঠামোতেই পরিবর্তন আনার উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • গ্রেডভেদে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার পরিবর্তন;
  • বাড়িভাড়া ভাতার হার পুনর্নির্ধারণ;
  • চিকিৎসা ভাতায় পরিবর্তন;
  • যাতায়াত ভাতা বৃদ্ধি;
  • টিফিন ভাতা বৃদ্ধি;
  • ধোলাই ভাতা বৃদ্ধি;
  • মোবাইল ভাতার নতুন কাঠামো;
  • বাংলা নববর্ষ ভাতার হার পরিবর্তন;
  • কিছু বিশেষ ভাতা পুনর্নির্ধারণ;
  • বিদ্যমান বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহার।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য মাসে ১৫০ টাকা এবং ১ম থেকে ৫ম গ্রেডের জন্য ৫০০ টাকা মোবাইল ভাতার কাঠামোর কথাও বলা হয়েছে।

চাকরিজীবীদের জন্য এর অর্থ কী?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের মাসিক বেতন হিসাবের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে মূল বেতনের সঙ্গে যে বিশেষ সুবিধা যোগ হচ্ছে, নতুন কাঠামোয় সেটি আলাদা করে যোগ না হয়ে নতুন বেতন কাঠামোর নির্ধারিত বেতন ও ভাতার ভিত্তিতে হিসাব হবে।

ফলে কারও ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা হারানোর কারণে একদিকে অতিরিক্ত একটি অংশ বন্ধ হবে, অন্যদিকে নতুন মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতা বাড়ার কারণে মোট প্রাপ্তি বাড়তে পারে। আবার কোন গ্রেডে কতটা পরিবর্তন হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট গ্রেডের নতুন মূল বেতন এবং প্রযোজ্য ভাতার ওপর।

এ কারণেই ‘বিশেষ সুবিধা বাতিল = বেতন কমে যাওয়া’—এমন সরল হিসাব সঠিক নয়। একইভাবে ‘বেসিক ৫০ শতাংশ বাড়লে হাতে পাওয়া বেতনও ৫০ শতাংশ বাড়বে’—এমন হিসাবও সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণ করবে প্রজ্ঞাপন

নতুন জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট ও ভাতার বিভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে একজন চাকরিজীবীর হাতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা বাড়বে বা কমবে, সেটি নিশ্চিতভাবে জানতে হলে চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন, বেতন নির্ধারণের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়ন নির্দেশনা দেখতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে জাতীয় বেতন স্কেল–২০১৫-এর আদেশসমূহের পাশাপাশি ‘বেতন স্কেল (খসড়া ২০২৬)’ সম্পর্কিত বিভাগও রয়েছে।

শেষ কথা

নতুন জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ কার্যকর হলে বর্তমানে চালু থাকা ১০ ও ১৫ শতাংশের ‘বিশেষ সুবিধা’ আলাদাভাবে বহাল না থাকার বিষয়টি এখন আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০২৪ সালে শুরু হওয়া এই সুবিধা ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে গ্রেডভেদে ১০ ও ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট ও বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের সামগ্রিক বেতন কাঠামো নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে।

তাই নতুন পে স্কেলের প্রকৃত আর্থিক প্রভাব বুঝতে বিশেষ প্রণোদনা বাতিলের বিষয়টি একা নয়, বরং নতুন মূল বেতন + ইনক্রিমেন্ট + বাড়িভাড়া + চিকিৎসা + অন্যান্য ভাতা—সবকিছুর সম্মিলিত হিসাব দেখতে হবে। চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই প্রতিটি গ্রেডে চাকরিজীবীদের প্রকৃত আর্থিক পরিবর্তনের নির্ভুল হিসাব পাওয়া যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *