উচ্চতর গ্রেডে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব: ৮ বছরেই প্রথম, ৬ বছর পর দ্বিতীয়—ব্লক পোস্টে তৃতীয় গ্রেডের সুযোগ
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব সামনে এসেছে। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মচারীকে প্রথম উচ্চতর গ্রেডের জন্য আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়ে চাকরির ৮ বছর পূর্তিতে প্রথম উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এরপর আরও ৬ বছর চাকরি পূর্ণ হলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড এবং নির্দিষ্ট শর্তে ব্লক পোস্টে কর্মরতদের ক্ষেত্রে আরও ৮ বছর পর তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি এখনো প্রস্তাবিত কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। চূড়ান্ত গেজেট বা সরকারি আদেশে সময়সীমা, যোগ্যতা, পদোন্নতির সঙ্গে সমন্বয় এবং ব্লক পোস্টের সংজ্ঞা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেটিই হবে কার্যকর বিধান। বর্তমান জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-সংক্রান্ত সরকারি নথিতে উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে ভিন্ন সময়সীমার বিধান রয়েছে; তাই নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে সেটি বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে।
৮ বছর পর প্রথম উচ্চতর গ্রেড
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন হচ্ছে প্রথম উচ্চতর গ্রেডের সময় ৮ বছর নির্ধারণ। অর্থাৎ কোনো কর্মচারী একই পদে বা সংশ্লিষ্ট যোগ্যতার শর্ত পূরণ করে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চাকরি করলে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এর ফলে দীর্ঘদিন একই পদে দায়িত্ব পালন করেও পদোন্নতির সুযোগ না পাওয়া কর্মচারীদের বেতন কাঠামোর অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে দ্রুত হতে পারে।
বর্তমান ব্যবস্থায় উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে ৬ বছর পূর্তির পর পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডের বিধান সম্পর্কিত সরকারি স্পষ্টীকরণ রয়েছে। আবার বিভিন্ন দপ্তরের সাম্প্রতিক আদেশে একই পদে ১০ বছর পূর্তির পর উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার নজিরও দেখা যায়। অর্থাৎ বাস্তবে উচ্চতর গ্রেডের প্রয়োগে পদ, বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এরপর ৬ বছর পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড
প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর আরও ৬ বছর চাকরি পূর্ণ হলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার প্রস্তাবটি কর্মচারীদের ক্যারিয়ার কাঠামোয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
সহজ হিসাব করলে—
- চাকরির শুরু → ৮ বছর → প্রথম উচ্চতর গ্রেড
- প্রথম উচ্চতর গ্রেডের পর → ৬ বছর → দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড
- দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের পর → আরও ৮ বছর → নির্দিষ্ট ব্লক পোস্টে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড
অর্থাৎ সাধারণ ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের জন্য মোট ১৪ বছরের চাকরির সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড সবার জন্য নয়
প্রস্তাবিত কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড সবার জন্য প্রযোজ্য নয়।
শুধু ব্লক পোস্টে কর্মরত এবং সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণকারী কর্মচারীদের জন্য দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের পর আরও ৮ বছর চাকরি শেষে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার সুযোগ রাখা হতে পারে।
এখানে ‘ব্লক পোস্ট’ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো পদকে ব্লক পোস্ট হিসেবে গণ্য করা হবে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট পদসৃজন, পদোন্নতির কাঠামো, অনুমোদিত জনবল এবং চাকরির বিধিমালার ওপর নির্ভর করবে। ফলে শুধু দীর্ঘদিন একই পদে চাকরি করলেই তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।
একটি উদাহরণে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়
ধরা যাক, একজন কর্মচারী এমন একটি পদে যোগ দিলেন যেখানে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সীমিত।
চাকরির ১ম বছর থেকে ৮ বছর:
নিজ পদে চাকরি করার পর যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করলে প্রথম উচ্চতর গ্রেড।
৯ম থেকে ১৪তম বছর:
প্রথম উচ্চতর গ্রেডে থাকার পর আরও ৬ বছর পূর্ণ হলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড।
১৫তম থেকে ২২তম বছর:
যদি পদটি নির্ধারিত ব্লক পোস্টের আওতায় পড়ে এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়, তাহলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের পর আরও ৮ বছর শেষে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ।
অর্থাৎ এই প্রস্তাব কার্যকর হলে দীর্ঘদিন পদোন্নতিহীন কর্মচারীদের জন্য সময়ভিত্তিক আর্থিক অগ্রগতির একটি ধারাবাহিক কাঠামো তৈরি হতে পারে।
পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেড এক বিষয় নয়
এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। উচ্চতর গ্রেড মানেই পদোন্নতি নয়।
পদোন্নতির মাধ্যমে একজন কর্মচারী উচ্চতর দায়িত্ব ও পদে নিয়োগ পান। অন্যদিকে উচ্চতর গ্রেড মূলত নির্দিষ্ট শর্তে বেতন-গ্রেড উন্নয়নের একটি ব্যবস্থা। তাই উচ্চতর গ্রেড পেলেই পদবি বা দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হবে—এমনটি নয়।
এ কারণে নতুন ব্যবস্থায় পদোন্নতি এবং উচ্চতর গ্রেড—দুই প্রক্রিয়ার মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটি চূড়ান্ত বিধিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
কারা বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখছেন
উচ্চতর গ্রেডের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাদের জন্য, যাদের পদে পদোন্নতির সুযোগ কম অথবা দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ ধরনের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি উচ্চতর গ্রেড বেতন বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একই পদে দীর্ঘদিন চাকরির পর উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার আদেশ প্রকাশিত হয়েছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামোতে উচ্চতর গ্রেডের সময়সীমা নির্ধারণকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই হবে মূল বিষয়
প্রস্তাবিত ৮+৬+৮ বছরের কাঠামো নিয়ে আলোচনা থাকলেও এর বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে চূড়ান্ত জাতীয় বেতন কাঠামো, সরকারি প্রজ্ঞাপন/আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা বা স্পষ্টীকরণের ওপর।
বিশেষ করে নিচের বিষয়গুলো চূড়ান্তভাবে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন—
- ৮ বছর গণনা হবে চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে নাকি নির্দিষ্ট পদে যোগদানের তারিখ থেকে।
- পদোন্নতি হলে আগের চাকরিকাল কীভাবে গণনা হবে।
- পূর্বে পাওয়া উচ্চতর গ্রেড নতুন ব্যবস্থায় কীভাবে সমন্বয় হবে।
- দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম উচ্চতর গ্রেডের তারিখ কীভাবে বিবেচিত হবে।
- ‘ব্লক পোস্ট’ বলতে কোন কোন পদকে বোঝানো হবে।
- তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের জন্য অতিরিক্ত কী কী যোগ্যতা থাকবে।
- পূর্বের চাকরিকাল বা আন্তঃক্যাডার/আন্তঃদপ্তর বদলির ক্ষেত্রে চাকরির সময় গণনার নিয়ম কী হবে।
সারকথা
প্রস্তাবিত কাঠামোর মূল ধারণাটি হলো—পদোন্নতি না হলেও নির্দিষ্ট সময় পর বেতন-গ্রেডে অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করা। সেখানে প্রথম উচ্চতর গ্রেডের জন্য ৮ বছর, দ্বিতীয়টির জন্য আরও ৬ বছর এবং নির্দিষ্ট ব্লক পোস্টের ক্ষেত্রে তৃতীয়টির জন্য আরও ৮ বছর সময় ধরা হলে দীর্ঘমেয়াদি চাকরিজীবনে কর্মচারীদের আর্থিক অগ্রগতির একটি নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
তবে এটিকে এখনই চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বর্তমানে প্রচলিত বিধান ও বিভিন্ন দপ্তরের আদেশে উচ্চতর গ্রেডের সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন প্রয়োগ দেখা যায়। তাই চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্টীকরণই নির্ধারণ করবে—৮ বছর, ৬ বছর ও ৮ বছরের এই কাঠামো ঠিক কোন কর্মচারীর ক্ষেত্রে কীভাবে কার্যকর হবে।

